যত্ন ও জখম

উপস্থাপনা
মিথস্ক্রিয়া
প্রদর্শনী

মে দিবস উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী আয়োজন

সমসাময়িক বাংলাদেশের শিল্পচর্চার প্রেক্ষাপটে ‘যত্ন ও জখম’ একটি গুরুত্বপূর্ণ কিউরেটোরিয়াল উদ্যোগ এবং KUN Creative Studio-এর প্রথম সম্মিলিত শিল্পপ্রয়াস। প্রদর্শনীটি শিল্প, উপস্থাপনা ও মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শ্রম, বস্তু এবং দৈনন্দিন জীবনের পারস্পরিক সম্পর্ককে নতুনভাবে অন্বেষণ করেছে। বিশেষত কাঠশিল্প ও কারুশিল্পে প্রযুক্তির প্রসার যেমন উৎপাদনকে দ্রুততর করেছে, তেমনি শ্রমের শর্ত—বিশেষত নিরাপত্তা, স্বীকৃতি ও মানবিক মর্যাদা—অনেক ক্ষেত্রেই অনিশ্চিত রয়ে গেছে। এই বৈপরীত্য থেকেই প্রদর্শনীটি শ্রমকে কেবল উৎপাদন প্রক্রিয়ার একটি উপাদান হিসেবে নয়, বরং একটি জটিল মানবিক, নৈতিক ও যত্ননির্ভর প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করেছে।

‘যত্ন ও জখম’ শিরোনামটি নিজেই এই দ্বৈত বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। ‘Cut’ যেমন কাঠ বা অন্য কোনো উপাদানকে একটি নির্দিষ্ট রূপে রূপান্তরের প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে, তেমনি তা শ্রমিকের শরীরের ওপর আরোপিত ঝুঁকি ও শারীরিক শ্রমের বাস্তবতাকেও স্মরণ করিয়ে দেয়। বিপরীতে, ‘Comfort’ নির্দেশ করে সেই চূড়ান্ত স্বাচ্ছন্দ্যকে, যা একজন ভোক্তা একটি মসৃণ, পরিপূর্ণ ও ব্যবহারযোগ্য বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কিত করে অনুভব করেন। এই স্বাচ্ছন্দ্যের অন্তরালে যে শ্রম, ঝুঁকি ও যত্ন নিহিত থাকে, প্রদর্শনীটি সেই অদৃশ্য প্রক্রিয়াটিকেই দৃশ্যমান করতে চেয়েছে।

Karl Marx-এর Commodity Fetishism ধারণার আলোকে একটি পণ্য কীভাবে তার উৎপাদন-প্রক্রিয়া, শ্রম ও শ্রমিকের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সত্তা হিসেবে আমাদের সামনে উপস্থিত হয়, প্রদর্শনীটি সেই অদৃশ্যতাকে প্রশ্ন করে। ব্যবহারের মুহূর্তে যে বস্তুটি কেবল একটি সম্পূর্ণ পণ্য হিসেবে ধরা দেয়, তার পেছনে থাকা শ্রম, সময়, দক্ষতা ও ঝুঁকিকে পুনরায় দৃশ্যমান করার মধ্য দিয়ে ‘যত্ন ও জখম’ পণ্য ও শ্রমের সম্পর্ককে নতুনভাবে ভাবার আহ্বান জানায়।

একই সঙ্গে Carol Gilligan ও Joan Tronto-র Care Theory-এর আলোকে এখানে শ্রমকে একটি যত্ননির্ভর চর্চা হিসেবেও পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে। শ্রমিক কেবল একজন উৎপাদক নন; তাঁর দক্ষতা, সতর্কতা ও শারীরিক শ্রম এমন একটি অদৃশ্য যত্নের কাঠামো তৈরি করে, যার ফলাফল ভোক্তার নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতার মধ্যে প্রতিফলিত হয়। ফলে প্রদর্শনীটি শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্যায়নের পাশাপাশি তার মানবিক ও নৈতিক মাত্রাকেও সামনে নিয়ে আসে।

এই অর্থে ‘যত্ন ও জখম’ কেবল বস্তু বা শিল্পকর্মের প্রদর্শনী নয়; এটি বস্তু কীভাবে তৈরি হয়, কার শ্রমে তৈরি হয় এবং সেই শ্রম কীভাবে আমাদের দৈনন্দিন স্বাচ্ছন্দ্যের অন্তরালে অদৃশ্য হয়ে যায়—সেই প্রশ্নগুলোর একটি সমকালীন শিল্পভাষায় পুনর্পাঠ।

গ্যালারী

গ্যালারিতে প্রদর্শিত শিল্পকর্ম ও প্রদর্শনীর বিশেষ কিছু মুহুর্ত